১৪ বছর বয়সে কিশোর-কিশোরীরা যখন স্কুল শেষে কী করবে তা নিয়ে দ্বিধায় থাকে, তখন জয়নাম জৈন করে দেখিয়েছেন এমন এক কীর্তি—যা অর্জন করতে অনেক উদ্যোক্তার বছরের পর বছর কেটে যায়। দুবাইয়ের বিখ্যাত বুর্জ খলিফার ১৪১ তলায় অফিস নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই স্টার্টআপ।
অফিশিয়াল ওয়েবসাইট অনুযায়ী, তিনিই দুবাইয়ের সবচেয়ে কম বয়সি এআই প্রতিষ্ঠাতা।
ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই কিশোর ‘মেঙ্গো ইঞ্জিন’ নামক একটি এআই প্ল্যাটফর্মের প্রতিষ্ঠাতা। এটি এমন একটি প্রযুক্তি যা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিপণন, গ্রাহক সংযোগ, বিক্রি এবং কনটেন্ট তৈরির কাজ স্বয়ংক্রিয় করতে সাহায্য করে।
আরও পড়ুন: সুইডেনে উচ্চশিক্ষা: আবেদন, যোগ্যতা, খরচ ও আবাসন অনুমতির যা জানা দরকার
তার এই সাফল্যের গল্প সম্প্রতি ইন্টারনেটে দারুণভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে জয়নামের মতে, এআই নিয়ে মানুষের উন্মাদনা শুরু হওয়ার অনেক আগেই তার এই যাত্রার সূচনা হয়েছিল।
১৪ বছর বয়সি এই কিশোরকে ইতোমধ্যে তার অসাধারণ ব্যবসায়িক ও প্রযুক্তিগত প্রতিভার কারণে জনপরিসরে এবং বিভিন্ন প্রযুক্তি সম্মেলনে ‘নেক্সট ইলন মাস্ক’ বলে অভিহিত করা হচ্ছে। মাস্কের মতোই জয়নাম প্রচলিত পড়াশোনার গণ্ডির বাইরে গিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও নিজের দক্ষতা বাড়াতে বেশি মনোযোগী হয়েছেন।
‘কার্লি টেলস মিডল ইস্ট’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জয়নাম জানান, মাত্র ছয় বছর বয়সে তিনি তার জীবনের প্রথম ব্যবসায়িক পাঠ পান।
তিনি স্মরণ করে বলেন, ‘আমার বয়স যখন মাত্র ছয় বছর, তখন বাবা আমাকে তার প্রথম ব্যবসায়িক মিটিংয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।’ শৈশবের সেই অভিজ্ঞতা তার মধ্যে এক প্রবল কৌতূহল তৈরি করে, যা সময়ের সঙ্গে আরও পোক্ত হয়। কেবল শ্রেণিকক্ষের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি মানুষের সঙ্গে মিশে, বিভিন্ন ইভেন্টে অংশ নিয়ে এবং নিজের ওপর নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে ব্যবসা কীভাবে কাজ করে তা শিখতে শুরু করেন।
মাত্র ১৩ বছর বয়সেই তিনি মাত্র ১০৫ দিনের মধ্যে আইজিসিএসই দশম শ্রেণির পরীক্ষা সম্পন্ন করেন। পড়াশোনার এই ব্যতিক্রমী পথটি তাকে তার ব্যবসায়িক স্বপ্ন পূরণের জন্য আরও বেশি সময় বের করে দিতে সাহায্য করেছে।
আরও পড়ুন: বিশ্বসেরা ৩০ স্কলারশিপের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট
শুধু একটি স্টার্টআপ নয়, আরও অনেক অর্জন
মেঙ্গো ইঞ্জিনকে জয়নাম এমনভাবে গড়ে তুলতে চান, যা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি ‘এআই কো-ফাউন্ডার’ বা সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে কাজ করবে। এটি বিপণন থেকে শুরু করে লিড ম্যানেজমেন্ট, নিউজলেটার এবং গ্রাহক যোগাযোগের মতো কাজগুলোকে সহজ করে দেয়। প্ল্যাটফর্মটি বর্তমানে বেটা সংস্করণে রয়েছে এবং বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান এটি ব্যবহারের অপেক্ষায় রয়েছে।
তবে তার অর্জন এখানেই থেমে নেই। জয়নাম একটি টেডএক্স মঞ্চে বক্তব্য দিয়েছেন, দুটি পেটেন্টের অধিকারী হয়েছেন এবং আরও কিছু পেটেন্ট পাইপলাইনে রয়েছে। এ ছাড়া তিনি একটি বই লিখেছেন এবং ইউটিউবে ১ লাখ ৪৫ হাজারেরও বেশি সাবস্ক্রাইবার নিয়ে একটি কমিউনিটি গড়ে তুলেছেন। তার এই সাফল্যের পেছনের মূল চাবিকাঠি হলো ধারাবাহিকতা।
দশ বছর বয়স থেকেই তিনি নিয়ম করে ‘৫০ দিনের চ্যালেঞ্জ’ গ্রহণ করে আসছেন। এর অংশ হিসেবে তিনি ৫০টি বই পড়েছেন, ৫০টি নেটওয়ার্কিং ইভেন্টে যোগ দিয়েছেন এবং উদ্যোক্তাদের সঙ্গে দেখা করতে ও তাদের কাছ থেকে শিখতে ভারতের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে প্রায় ৬,০০০ কিলোমিটার ভ্রমণ করেছেন।
তবে জয়নামের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি কেবল বুর্জ খলিফার অফিস নয়,= বরং পড়াশোনা ও জীবনকে দেখার তার দৃষ্টিভঙ্গি।
আরও পড়ুন: আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য সুইডেনের ১০ স্কলারশিপ
তার এই জীবনযাত্রা প্রমাণ করে যে আজকের দিনে শিক্ষা কেবল চার দেওয়ালের শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়। কৌতূহল, মানুষের সঙ্গে আলোচনা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা তার এই পথচলায় সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এত কম বয়সে তার অর্জনগুলো এত আলোচনা তৈরি করা সত্ত্বেও জয়নামের লক্ষ্য স্থির রয়েছে ভবিষ্যতের পানে।
কার্লি টেলস মিডল ইস্টের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, তিনি এমন একটি ইউনিকর্ন কোম্পানি গড়ে তুলতে চান যা বিশ্বে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। আর এর মাধ্যমেই তিনি প্রমাণ করতে চান যে বয়সের সংখ্যা কখনো মানুষের বড় স্বপ্নের আকৃতি নির্ধারণ করে না।
সাধারণ কিশোরদের কাছে ১৪ বছর বয়স মানে নতুন শখ বা আগ্রহ খুঁজে পাওয়ার সময়। কিন্তু জয়নাম জৈনের কাছে এটি হলো নিজের জানালার বাইরে পৃথিবীর অন্যতম বিখ্যাত স্কাইলাইন বা শহর দেখতে দেখতে আস্ত এক ব্যবসা দাঁড় করানোর বয়স।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে

