সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, উদ্ভাবন, গবেষণা ও প্রযুক্তির জন্য ইউরোপের অন্যতম পরিচিত দেশ সুইডেন। উচ্চশিক্ষার জন্যও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে দেশটি বেশ জনপ্রিয়। দেশটিতে ৩৯টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত ১৯টি বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষায় পরিচালিত এক হাজারের বেশি শিক্ষাক্রম রয়েছে।
টাইমস হায়ার এডুকেশনের বিশ্ব বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিংয়ে সুইডেনের ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয় তালিকাভুক্ত হয়েছে। দেশটির মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে কারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট। বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান ৫০তম। তবে সুইডেনে পড়াশোনার ক্ষেত্রে আবহাওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। দেশটিতে শীতকালে তাপমাত্রা অনেক কম থাকে। দিনের আলো থাকার সময়ের মধ্যেও ভিন্নতা দেখা যায়। ফলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কম তাপমাত্রা ও ভিন্ন দিনের আলোচক্রের সঙ্গে সহজে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা থাকা প্রয়োজন।
একজন শিক্ষার্থী সুইডেনে পড়াশোনার জন্য আবেদন করার আগে বিষয়টি নিশ্চিত হতে শীতের ছুটিতে দেশটিতে অবস্থান করেছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি দেশটির আবহাওয়া ও পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবেন কি না, তা বোঝার চেষ্টা করেন।
সুইডেনে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন কখন
আরও পড়ুন: ঘরে বসেই যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্টিফিকেটসহ ফ্রি অনলাইন কোর্সের সুযোগ, আবেদন যেভাবে
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউরোপীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের দেশগুলোর নাগরিক এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশের নাগরিকেরা ইংরেজি ভাষায় পরিচালিত কোর্স ও শিক্ষাক্রমে ভর্তির জন্য দুটি আবেদন পর্বের যেকোনোটিতে আবেদন করতে পারেন।
প্রথম আবেদন পর্বের আবেদনের শেষ সময় সাধারণত জানুয়ারির মাঝামাঝি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে। দ্বিতীয় আবেদন পর্বে আবেদনের শেষ সময় ১৫ এপ্রিল। এ পর্বে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় জুলাইয়ের শুরুর দিকে।
তবে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশোনা শেষ করার পর আবেদন করা উচিত। কারণ আবেদনের সময় চূড়ান্ত শিক্ষাগত ফলাফল বা বিদ্যালয়ের চূড়ান্ত নম্বরপত্র জমা দিতে হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশের নাগরিকদের সুইডেনে পড়াশোনার জন্য আবাসন অনুমতি নিতে হয়। এ কারণে পর্যাপ্ত সময় হাতে রেখে বসন্তকালীন সেমিস্টার অথবা পরবর্তী শরৎকালীন সেমিস্টারের জন্য আবেদন করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে আবাসন অনুমতি পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সময় পাওয়া যায়।
যেসব শিক্ষার্থী ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউরোপীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলভুক্ত দেশ বা সুইজারল্যান্ডে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেছেন কিংবা আন্তর্জাতিক ব্যাকালোরিয়েট বা ইউরোপীয় ব্যাকালোরিয়েট শিক্ষার্থী, তারা শরৎকালীন সেমিস্টারে ভর্তির জন্য ৫ জুলাই পর্যন্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে পারবেন। আন্তর্জাতিক ব্যাকালোরিয়েট ও ইউরোপীয় ব্যাকালোরিয়েট যোগ্যতা থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য আবেদনের ক্ষেত্রে বিশেষ নির্দেশনাও রয়েছে।
সুইডেনে বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের ধাপ
প্রথম ধাপ: ভর্তি পোর্টালে অ্যাকাউন্ট তৈরি
সুইডেনে বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের জন্য দুটি প্রধান পোর্টাল রয়েছে। ইংরেজি ভাষায় পরিচালিত শিক্ষাক্রমের জন্য ইউনিভার্সিটি অ্যাডমিশনস পোর্টাল এবং সুইডিশ ভাষায় পরিচালিত শিক্ষাক্রমের জন্য অ্যান্টাগনিং পোর্টাল ব্যবহার করা হয়।
আরও পড়ুন: আমেরিকায় মাস্টার্স বা পিএইচডি প্রোগ্রামে কখন আবেদন করবেন, করণীয় কী কী
এসব পোর্টালে সুইডেনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাক্রম, ভর্তি প্রক্রিয়া, বৃত্তি ও অর্থায়ন বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়। পাশাপাশি ওয়েবিনার ও অনলাইন বিশ্ববিদ্যালয় মেলার তথ্যও পাওয়া যায়। শিক্ষার্থীদের আবেদনের শেষ সময়ের অনেক আগেই অ্যাকাউন্ট তৈরি করে আবেদন প্রক্রিয়া শুরু করা উচিত।
দ্বিতীয় ধাপ: প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা
শিক্ষার্থীকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইস্যু করা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হবে। এসব কাগজপত্রের বৈধতা নিশ্চিত করতে সাধারণত সিল, সিলমোহর ও স্বাক্ষর থাকতে হয়। কিছু দেশের শিক্ষাগত কাগজপত্র ইংরেজিতে অনুবাদ করে জমা দিতে হয়।
সুইডেনের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আবেদনকারীকে সাধারণ ও নির্দিষ্ট—দুই ধরনের যোগ্যতা পূরণ করতে হয়। পাশাপাশি আবেদনকারীর একটি মেধা স্কোর থাকতে হয়। এটি অনেকটা জিপিএর মতো। মাধ্যমিক-পরবর্তী পর্যায়ে সম্পন্ন করা শিক্ষাক্রম ও অর্জিত ফলাফলের ভিত্তিতে এ মেধা স্কোর হিসাব করা হয়।
সাধারণ ভর্তির যোগ্যতা
আবেদনের আগে শিক্ষার্থীকে মাধ্যমিক-পরবর্তী শিক্ষা সম্পন্ন করতে হবে। কারণ আবেদনের সময় চূড়ান্ত শিক্ষাগত ফলাফলের নম্বরপত্র জমা দিতে হয়। শিক্ষার্থীকে সুইডেনের মাধ্যমিক পর্যায়ের ইংরেজি ৬ কোর্সের সমমানের ইংরেজি ভাষার দক্ষতার প্রমাণ দিতে হবে। ইংরেজি ভাষার দক্ষতা যাচাইয়ের পরীক্ষার ফলাফলও এ ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
সুইডেনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গণিতের অতিরিক্ত যোগ্যতার শর্তও রয়েছে। আবেদনকারীকে সুইডেনের গণিত ১এ, ১বি বা ১সি কোর্সের সমমানের গণিতের কোর্স সফলভাবে সম্পন্ন করতে হবে। কোন শিক্ষাক্রমে কী ধরনের গণিতের যোগ্যতা প্রয়োজন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রমের পেজে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে।
নির্দিষ্ট ভর্তির যোগ্যতা
কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় আবেদনকারী নির্দিষ্ট কোনো বিষয় নির্দিষ্ট পর্যায়ে পড়েছেন কি না, তা বিবেচনা করে। তাই যে শিক্ষাক্রমে আবেদন করা হবে, তার নির্দিষ্ট যোগ্যতা সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট থেকে দেখে নিতে হবে। এ ছাড়া কিছু শিক্ষাক্রমে অনুপ্রেরণাপত্র, সুপারিশপত্র ও জীবনবৃত্তান্ত প্রয়োজন হতে পারে। বৈধ পাসপোর্ট বা পরিচয়পত্রও প্রয়োজন হবে।
শিক্ষার্থী যে দেশে স্কুল বা মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা সম্পন্ন করেছেন, সেই দেশের জন্য নির্ধারিত তথ্য ও যোগ্যতার শর্তও ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। কারণ দেশভেদে এসব শর্তে পার্থক্য থাকতে পারে।
তৃতীয় ধাপ: পছন্দের শিক্ষাক্রমের ক্রম নির্ধারণ
আরও পড়ুন: পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপ দেবে ইউজিসি, আবেদন ৩১ অক্টোবরের মধ্যেই
একজন আবেদনকারী সর্বোচ্চ আটটি শিক্ষাক্রম বেছে নিতে পারবেন। এসব শিক্ষাক্রম নিজের পছন্দ অনুযায়ী ক্রম নির্ধারণ করে সাজাতে হবে।আবেদনকারী যে শিক্ষাক্রমগুলোতে আবেদন করবেন, সেগুলো প্রথম পছন্দ থেকে ধারাবাহিকভাবে বিবেচনা করা হবে। কোনো একটি শিক্ষাক্রমে ভর্তির সুযোগ পেলে তার নিচে থাকা পছন্দের শিক্ষাক্রমগুলোর আবেদন বাতিল হয়ে যাবে।
চতুর্থ ধাপ: আবেদন ফি পরিশোধ
আবেদন জমা দেওয়ার পর সর্বোচ্চ দুই সপ্তাহের মধ্যে আবেদন ফি পরিশোধ করা যাবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউরোপীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাইরের দেশগুলোর আবেদনকারীদের জন্য এ ফি প্রযোজ্য।
আবেদন ফি প্রায় ৯০ ইউরো বা ৭৬ পাউন্ড।
বৃত্তি ও অর্থায়ন
সুইডেনে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য বৃত্তি ও অন্যান্য অর্থায়নের সুযোগ খুঁজছেন এমন শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট তথ্যভান্ডার থেকে বৃত্তি ও অর্থায়ন বিষয়ে তথ্য জানতে পারবেন।
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাক্রমভেদে বৃত্তির সুযোগ ও অর্থায়নের শর্ত আলাদা হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তি ও অর্থায়নের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
সুইডেনে পড়াশোনার জন্য আবাসন অনুমতি
সুইজারল্যান্ড এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউরোপীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাইরের দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের সুইডেনে পড়াশোনার জন্য আবাসন অনুমতি নিতে হবে।
আবাসন অনুমতির জন্য আবেদন প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও অন্যান্য শর্ত সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশের শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও আবাসন অনুমতির পুরো প্রক্রিয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় হাতে রেখে আবেদন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

