ঘুম শুধু শরীরের বিশ্রামের সময় নয়। এই সময় মস্তিষ্ক তথ্য প্রক্রিয়াজাত করে, শরীরের বিভিন্ন টিস্যু মেরামত হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও শারীরিক ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের সুযোগ পায়। তবু অনেক প্রাপ্তবয়স্ক নিয়মিত মাত্র ছয় ঘণ্টা ঘুমান এবং মনে করেন, এর সঙ্গে তারা অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। তাহলে কি ছয় ঘণ্টার ঘুম যথেষ্ট?
বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য নিয়মিতভাবে ছয় ঘণ্টা ঘুম যথেষ্ট নয়। সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের কমপক্ষে সাত ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন হয়, যদিও বয়সভেদে প্রয়োজনীয় ঘুমের পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে। প্রতিদিন সকালে ছয়, সাত বা আট ঘণ্টা ঘুমের পার্থক্য খুব বেশি মনে নাও হতে পারে। তবে শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় নিয়মিত কম ঘুম ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বয়স অনুযায়ী কতটা ঘুম প্রয়োজন?
জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ঘুমের প্রয়োজনীয়তা পরিবর্তিত হয়। সিডিসি (CDC) অনুযায়ী, নবজাতকদের প্রতিদিন ১৪ থেকে ১৭ ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন হতে পারে। আর ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের জন্য সাধারণত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুমকে পর্যাপ্ত ধরা হয়।
আরও পড়ুন: আমিরাতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা আলজেরিয়ার
বয়সভেদে ঘুমের প্রয়োজনীয়তা হলো—০ থেকে ৩ মাস বয়সী নবজাতকের ১৪ থেকে ১৭ ঘণ্টা, ৪ থেকে ১২ মাস বয়সী শিশুর ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা, ১ থেকে ২ বছর বয়সী শিশুর ১১ থেকে ১৪ ঘণ্টা, ৩ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুর ১০ থেকে ১৩ ঘণ্টা, ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুর ৯ থেকে ১২ ঘণ্টা, ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা, ১৮ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের কমপক্ষে ৭ ঘণ্টা এবং ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন।
তাই প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা ঘুম বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য পর্যাপ্ত নয়। দীর্ঘমেয়াদি সুস্বাস্থ্যের জন্য এটি সাধারণত প্রস্তাবিত ঘুমের সময়ের চেয়ে কম। যদিও অনেকে মনে করেন, ছয় ঘণ্টা ঘুমিয়েও তারা স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারছেন।
কেন ছয় ঘণ্টা ঘুম যথেষ্ট বলে মনে হতে পারে?
এর একটি কারণ হতে পারে শরীরের সঙ্গে অভিযোজন। যিনি প্রতিরাতে ছয় ঘণ্টা ঘুমান, তিনি হয়তো ধীরে ধীরে ক্লান্তি কম অনুভব করতে শুরু করেন। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে শরীরের আর বেশি ঘুমের প্রয়োজন নেই।
কিছু মানুষের মধ্যে এমন জিনগত বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে, যার কারণে তারা স্বাভাবিকের তুলনায় কম ঘুমিয়েও মোটামুটি ভালোভাবে কাজ করতে পারেন। তাদের অনেক সময় ‘শর্ট স্লিপার’ বা স্বল্প ঘুমন্ত ব্যক্তি বলা হয়। তবে এ ধরনের মানুষ খুবই বিরল। বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে নিয়মিত ছয় ঘণ্টা ঘুমালে প্রয়োজনীয় ঘুমের তুলনায় ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
আরও পড়ুন: ১০০ কোটি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে নিয়ন্ত্রণহীন এআই: বিল গেটস
‘স্লিপ অ্যান্ড ব্রিদিং’-এ প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় ৬৯টি মেটা-অ্যানালাইসিস পরীক্ষা করে দেখা গেছে, অনুপযুক্ত ঘুমের সময়কাল বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে রয়েছে হৃদরোগ, স্মৃতিশক্তির অবক্ষয়, বিষণ্ণতা, মেটাবলিক সিনড্রোম এবং স্ট্রোক। গবেষকেরা আরও দেখেছেন, স্বল্প ঘুমানো মানুষের ক্ষেত্রে প্রতি এক ঘণ্টা ঘুম কমার সঙ্গে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে।
প্রতিরাতে মাত্র ৬ ঘণ্টা ঘুমালে কী হয়?
এর প্রভাব সবসময় তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না। তবে দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত কম ঘুম বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—
* মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া
* সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দুর্বল হওয়া
* মেজাজের পরিবর্তন
* উচ্চ রক্তচাপ
* বিপাকীয় সমস্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি
* ওজন বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি
* রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া
ছয় ঘণ্টা ঘুম যখন নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন সময়ের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। অপর্যাপ্ত ঘুম ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনকে প্রভাবিত করায় ওজন বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

